অনশনের রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা?

অনশনের রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা?

আখর বন্দ্যোপাধ্যায়

মেডিকেলে ছাত্রদের যে আমরণ অনশন চলছে, এবং আজকে যা ১৪ দিনে পা দেবে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিশেষ কিছু মতামত রাখছেন, যার কয়েকটি বেশ বিভ্রান্তিকর। এই ক্ষুদ্র রচনার মাধ্যমে সেগুলিকে খণ্ডন করাই আমার লক্ষ্য।

তাঁদের অনেকের মতে:

১. অনশন “as a strategy or political tool” কি আদৌ সমর্থনযোগ্য আর ফলপ্রদ? এটা কি “আত্মহত্যা”র পথ প্রসারিত করে না?

২. অনশন স্থগিত করা উচিত, কারণ অনশনরত ছাত্ররা খামোকা মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে। তার চেয়ে এসব ছেড়ে আন্দোলনে মন দেওয়া উচিত।

(১)-এর ব্যাপারে আমি কয়েকটি রেফারেন্স টেনে আনতে চাই:

আমরা জানি পৃথিবীজুড়ে বহু রাজনৈতিক আন্দোলনে অনশন হয়ে এসেছে। তবে সেইসব আন্দোলনগুলির মধ্যে সবথেকে বিখ্যাত হয়তো আয়ারল্যান্ড ও ভারত। আয়ারল্যান্ডের বিপ্লবীদের অনশনের ব্যাপারে আইরিশ বিপ্লবী ড্যান ব্রিন কি বলেছেন, সেটা পড়ে নেওয়াই যাক:

“Seán and his comrades went on hunger-strike in protest against the treatment meted out to them by their jailers. It was one of the first occasions in which the Irish political prisoners made use of this procedure. Five days after the hunger-strike began, Tom Ashe died as a result of the efforts made by the prison doctor and his attendants to use forcible feeding. The British were made to realize that Irishmen were prepared to die for their principles. The tragedy infuriated the whole Irish nation, and two days afterwards the British gave in and accorded prisoners in Mountjoy the conditions for which they campaigned. Forcible feeding of political prisoners on hunger-strike was never again attempted.” (My Fight For Irish Freedom, p. 28)

ভারতবর্ষের ঘটনাটিও প্রায় সমধর্মী, কারণ আমাদের ভারতীয় বিপ্লবীরা আয়ারল্যান্ডের সংগ্রামের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। ১৯২৯-এর জুন মাসে যখন ব্রিটিশ কতৃপক্ষের চরম দুর্ব্যবহারে ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত অনির্দিষ্টকালীন অনশন শুরু করেন, তখন কেই বা জানতো, যে এই অনশন একদিন ইতিহাসের পাতায় এক উজ্জ্বল স্থান অধিকার করে নেবে! পরে সেই অনশনে যোগ দেন ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বরের অন্যান্য সংগ্রামী সাথীরা। ১১৪ দিন মতন চলে সেই অনশন।

এটা ইতিহাস-অধ্যয়নকারীর কাছে জানা বিষয় যে সেই অনশন পৃথিবীর অন্য সমস্ত অনশনের রেকর্ডকে ভেঙে দেয়, ভারতবাসীকে আন্দোলিত করে জাগিয়ে তোলে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ১৯২৯-এর অক্টবর মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ শেষমেশ বিপ্লবীদের বেশিরভাগ দাবী মেনে নিতে বাধ্য হয়। অনেকটা আইরিশ বিপ্লবী Tom Ashe অথবা Terence Macswiney-দের মতোই আমাদের বিপ্লবী যতীন দাস ১৯২৯-এর ঐতিহাসিক অনশনের ৬৩তম দিন (১৩ই সেপ্টেম্বর, ১৯২৯) শহীদ হন।

এই অনশনের খবরে “কানপুর মজদুর পত্রিকা” লেখে (২০শে জুলাই, ১৯২৯):

পৃথিবীর সর্বত্রই বিপ্লবের মূল কথাই হলো বিক্ষোভ। নিপীড়ন ও অত্যাচারে বিক্ষোভের আগুন দাবানলের মতো বেড়ে ওঠে এবং সকল বাধাকে ধ্বংস করে। ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্ত যদি মারা যান, তাহলে ম্যাকসুইনির মৃত্যুতে আয়ারল্যান্ডে যে আলোড়নের সৃষ্টি হয়েছিল, ভারতবর্ষের জনচিত্তেও সেই আলোড়নের সৃষ্টি হবে।”

ওদিকে আমাদের মহম্মদ আলী জিন্নাহ সাহেব অনশনের সম্বন্ধে ১৯২৯এর সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইনসভায় দাঁড়িয়ে বলে ওঠেন:

“Well, you know perfectly well that these men are determined to die. It is not a joke. I ask the honourable law member to realise that it is not everybody who can go on starving himself to death. Try it for a little while and you will see…. The man who goes on hunger strike has a soul. He is moved by that soul and he believes in the justice of his cause; he is not an ordinary criminal who is guilty of cold-blooded, sordid, wicked crime.

“I regret that, rightly or wrongly, youth today in India is stirred up, and you cannot, when you have three hundred and odd millions of people, prevent such crimes being committed, however much you deplore them and however much you may say that they are misguided. It is the system, this damnable system of government, which is resented by the people.”

ভগৎ সিংয়ের সহযোদ্ধা বটুকেশ্বর দত্ত তাঁদের অনশন প্রসঙ্গে বলেছিলেন:

“The sentiments of truth develop in the mental consciousness and give immense strength to the suffering mind while sitting on hunger strike. There was a political concept underlying the hunger strike. These hunger strikes influenced the political conditions of the country very profoundly at that time. The hunger strikes started by them with the hope of death influenced the personal lives of the revolutionaries very deeply, but they remained hidden from the eyes of the masses. We, myself and Bhagat Singh, had started this strike in June 1929, in which Jatinder Nath Das achieved martyrdom, had a different type of picture of this path in my personal life. During the hunger strike we always conquered our sentiments and gained unlimited personal power. Ganesh Shankar Vidyarthi had named this hunger strike as a ‘great war between humanity and barbarity’. In these days an editorial of the Partap read, ‘Through the hunger strike an era of highest sacrifice has been permeated by them, and the proof of the inevitable, steady and unbound courage, which they have displayed is very praiseworthy, exemplary and worshipable’…” (Philosophy of Revolutionary Life) 

খেয়াল রাখতে হবে যে (১) এবং (২)-এর বক্তব্যের মধ্য ও শেষভাগ দুটি প্রায় এক। তাই অনশন কি আত্মহত্যা?” প্রসঙ্গে আমি ভগৎ সিংয়ের কথাগুলো সবাইকে ফের মনে করিয়ে দিতে চাইবো:

“At the time of our imprisonment, the condition for the political prisoners of our party were very miserable. We tried to improve that. I tell you quite seriously that we believed we would die very shortly. Neither we were aware of the technique of forced feeding nor did we ever think of it. We were ready to die. Do you mean to say that we were intending to commit suicide? No. Striving and sacrificing one’s life for a superior ideal can never be called suicide. We are envious of the death of our Comrade Yatindra Nath Das. Will you call it suicide? Ultimately, our sufferings bore fruit. A big movement started in the whole of the country. We were successful in our aim. Death in the struggles of this kind is an ideal death.” (Letter to Sukhdev regarding Suicide)

আমি কখনোই চাইনা যে মেডিকেলের অনশনরত কোনো সংগ্রামী ছাত্রের মৃত্যু হোক, স্বপ্নেও তা আমি চাইবো না। কিন্তু তার উল্টো দিকে তাদেরকে আন্দোলনের এই পর্যায়ে দাঁড়িয়ে এই পথ থেকে সরে আসতে বলবার ভুলটাও কক্ষনো করবো না। কেন? এর সঠিক উত্তর উপরের শেষ উদ্ধৃতিটিতেই রয়েছে।

আমি জানিনা এসবের থেকে আর কিসে অনশনের চরম রাজনৈতিক গুরুত্ব প্রকাশ পাচ্ছে! যাঁরা এই গুরুত্ব অস্বীকার করছেন, তাদের বলবো এই উদ্ধৃতিগুলো বারংবার পড়ুন, ভাবুন, ইতিহাসের পাতাগুলো ওল্টান! আইরিশ বিপ্লবী ড্যান ব্রিন বলেছিলেন:

“Irishmen would face death rather than surrender. It was all up to us.” 

যতীন দাসকে যখন বারংবার ডাক্তারের ওষুধ নেওয়ার, সঠিক পরিমানে খাবার খাওয়ার নির্দেশ দিচ্ছিলেন, যতীন দাস তখন বলে চলেছিলেন:

“I can live by my will-power. I have no confidence in the Government.

I cannot go back now. I can live alright with my will-power.”

আমি জানি যে এইসমস্ত উদ্ধৃতি আমাদের অনশনরত ছাত্র-ছাত্রীদের মনে আরো দৃঢ় সংগ্রামের প্রত্যয় জাগাবে। যাঁরা ভুল-ভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন, ছাত্রদের দিগ্ভ্রান্ত করতে চাইছেন, তাঁদের বলবো দয়া করে এসব না বলে অনশন-আন্দোলনকে আরো বেশি জোড়দার করে তোলবার প্রয়াস চালান, পাশে দাঁড়ান। এই অনশনকে জোড়দার করবার মাধ্যমে একটি বৃহৎ ফ্যাসিবাদ-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করা স্বম্ভব।

সংগ্রামী বন্ধুরা, আমরা করবো জয়, নিশ্চই! যদি লক্ষ্যে পৌঁছোবার জন্য বামমনস্ক প্রগতিশীল সমাজকে তোমাদের সঙ্গে অনশনে বসতে হয় এবং পথে নেমে আরো শক্তিশালী আন্দোলন শুরু করতে হয় – তাহলে সেই ভালো! আমরা তাই করবো! কারণ আমরা প্রত্যেকেই ভগৎ সিংয়ের ভাই, বটুকেশ্বরের ভাই, যতীন দাসের ভাই!

সংগ্রাম চিরঞ্জীবী হোক!

বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক!

 

 

 

One thought on “অনশনের রাজনৈতিক গুরুত্ব কতটা?

  1. At this juncture in the history of democratic movements, when everyone seems to be in a deep slumber of inaction, the hunger strike for a hostel may be a flint to kindle the heart of people. In that sense, the sacrifice of these students is worth it. But isn’t it a pity that such brilliant minds are needed to go to this extent to appeal to the people for such a meagre reason? However, in our days, when the atmosphere of the movements was not such damp, we just occupied the newly built hostel that had been allotted fir us and was later given to the stooges of the ruling party even they were not in need.

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s